ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দুর্ঘটনায় ৬ জনের মৃত্যু, ফায়ার সার্ভিসের অভিজ্ঞতা

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি:: গতকাল শুক্রবার ভোররাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার ভাটি-কালীসিমা এলাকার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাস ও মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে মাইক্রোবাসটিতে আগুন ধরে যায়। এ ঘটনায়ও ফায়ার সার্ভিসের তৎপরতা ছিল সবচেয়ে বেশি। আগুন নেভানো থেকে শুরু করে মাইক্রোবাসের ভেতর থেকে মরদেহ উদ্ধার ও হাইওয়ে পুলিশের কাছে মরদেহ হস্তান্তর থেকে পুলিশের সঙ্গে যানজট নিয়ন্ত্রণেও কাজ করেন ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এর মাধ্যমে সরাইল ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনে আগুন লাগার খবর আসে। দ্রুত আগুন নেভাতে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট। রাত ২টা দিকে ওই ইউনিটের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করেন। তাদের সঙ্গে উদ্ধার কাজে যোগ দেন হবিগঞ্জের মাধবপুর থেকে দুটি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে তিনটি ইউনিট। প্রায় ২০ মিনিট চেষ্ট চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন তারা।তবে ততক্ষণে আগুনে পুড়ে আঙ্গার হন মাইক্রোবাসে থাকা ছয় তরুণ। এরা হলেন, ১.সাগর (২২), ২. সোহান (২০), ৩.রিফাত (১৬), ৪.ইমন (১৯), ৫.শাকিল (২৫) ও ৬.হারুণ (৪০)। আগুন নেভার পর এক এক করে পোড়া লাশগুলো মাইক্রোবাসের ভেতর থেকে বের করে আনেন ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা।

baria-Fire-Service

তবে প্রতিটি দুর্যোগ ও দুর্ঘটনায় উদ্ধার কাজ করতে গিয়ে দুই ধরণের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা। এর একটি হলো সড়কের যানজট ও অপরটি ঘটনাস্থলে উৎসুক জনতার ঢল। শুক্রবার ভোররাতেও এমন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাদের। দুর্ঘটনার কারণে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে তীব্র যানজট তৈরি হয়। তখন যানজট ঠেলে দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার কাজ শুরু করাটাই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় ফায়ার সার্ভিস সদস্যদের জন্য।

এর কারণ হলো, কোনো গাড়িতে গ্যাসের কারণে আগুন লাগলে ৫-৭ মিনিটের মধ্যেই সব পুড়ে ছাই হয়ে যায়। বিজয়নগরের দুর্ঘটনায় এমনই হয়েছে। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে আগুন। সেজন্য সড়কে চলাচলকারী সব যানবাহনে অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা রাখা উচিত বলে মনে করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা। বিজয়নগরের দুর্ঘটনায়ও যদি অন্য যানবাহনে অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা থাকতো তাহলে তাৎক্ষণিক আগুন নিভিয়ে হতাহতের সংখ্যা কমানো যেত।

সরাইল ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের ইনচার্জ এস.এম শামীম বলেন, জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এর মাধ্যমে আমাদের কাছে ফোন আসে। আমরা তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হই। ২০ মিনিট চেষ্টা চালিয়ে আমরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনি। এরপর মাইক্রোবাসের ভেতর থেকে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করে হাইওয়ে পুলিশের কাছে তুলে দেই।

তিনি আরও বলেন, আমরাও রক্ত-মাংসের মানুষ। পোড়া লাশগুলো দেখে আমাদের কষ্ট হয়। যখন টেনে লাশগুলো বের করছিলাম তখন আমাদের সব সদস্যরা কষ্ট পাচ্ছিলেন। কিন্তু আগুন নিয়ে কাজ করতে করতে গিয়ে আমরা এসবে এখন অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের উপ-সহকারী পরিচালক মো. তানহারুল ইসলাম বলেন, পোড়া লাশগুলোর অবস্থা এতো বিভৎস হয় যে অনেকে দেখে রাতে ঘুমাতে পারবে না। অনেক সময় পুলিশও সাহস পায় না, তখন কাজগুলো আমাদেরকেই করতে হয়। আমরা কাজ করতে করতে এসবে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। কোনো একটি দুর্ঘটনা ঘটলে তখন অতিরিক্ত জনতার ঘিরে ধরে, সেজন্য আমাদের উদ্ধার কাজ করতে সমস্যা হয়। বিজয়নগরের দুর্ঘটনায়ও যানজটসহ অতিরিক্ত জনতার ঢলের কারণে উদ্ধার কাজে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছিল।

মহাসড়কে কোনো গাড়িতে আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানোর আগেই যেন আগুন নেভানোর কাজ শুরু করা যায় এজন্য সব গাড়িতে অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা রাখা উচিত। এগুলো খুব বেশি দাম না, কিন্তু মানুষের জীবন বাঁচাতে এগুলো খুবই প্রয়োজন।

baria-Fire-Service

তবে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা আসার আগে হাইওয়ে পুলিশ যখন দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশের লোকজনকে আগুন নেভাতে সাহায্যের অনুরোধ জানান তখন আগুনের ভয়ে এগিয়ে আসেননি কেউই। হয়তো কেউ এগিয়ে এলে হতাহতের সংখ্যা কম হতো।

খাঁটিহাতা হাইওয়ে থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) প্রেমধন মজুমদার বলেন, দুর্ঘটনার পরপরই আমরা ঘটনাস্থলে আসি। অনেককে সাহায্যের জন্য ডেকেছি, কিন্তু আগুনের ভয়ে কেউই এগিয়ে আসেনি। যদি কেউ এগিয়ে আসত তাহলে হয়তো আরও কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধার করা যেত। সব ধরনের আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে সবার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

এর আগে গতকাল শুক্রবার ভোররাতে বিজয়নগর উপজেলার ভাটি-কালীসিমা এলাকার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে সিলেটগামী একটি মাইক্রোবাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা ঢাকাগামী একটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এ সময় বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়কের পাশে খাদে পড়ে যায়। আর মাইক্রোবাসের গ্যাস সিলিন্ডার থেকে গ্যাস বের হয়ে আগুন ধরে যায়। এ ঘটনায় মাইক্রোবাসে থাকা ১০ আরোহীর মধ্যে ছয়জন অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান। আহত বাকি চারজনকে প্রথমে জেলা সদর হাসপাতাল ও পরে ঢাকায় পাঠানো হয়। হাতহতরা নারায়ণগঞ্জ থেকে সিলেটের হযরত শাহজালাল (র.) এর মাজার জিয়ারত করতে যাচ্ছিল। তাদের সবার বাড়ি নারায়ণগঞ্জে বন্দর থানার বিভিন্ন এলাকায়।

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

FaceBook